‘গুলশান লেকের নোংরা পানির মধ্যে অবরুদ্ধ জীবন। কাজকর্মও বন্ধ। এই মহাদুর্যোগেও সরকারি লোকের (সিটি করপোরেশন) দেখা নাই। নিজেরাই ঘরের পানি বের করার চেষ্টা করেছি। তবে সামলাতে পারছি না।’ এভাবেই বলছিলেন রিকশাচালক সিদ্দিক মিয়া।
একটু এগিয়ে সাংবাদিক পরিচয় দিতেই যেন মধ্যবয়সী সেলিনা বেগম আরও ক্ষুব্ধ। বললেন, ‘আমরা আবার মানুষ নাকি! সরকারের লোকজন আর সাংবাদিক দিয়ে আমাদের কী কাজে লাগবে। আমাদের কষ্ট তো আমাদেরই দেখতে হবে।’
রাজধানীর মহাখালীর কড়াইল বস্তির অধিকাংশ ঘরে গতকাল সোমবার দুপুরেও ছিল কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমরপানি। আগের দুদিনের টানা ভারী বর্ষণে যে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা তখনও কাটেনি।
এই দুর্ভোগ সিদ্দিক মিয়া কিংবা সেলিনা বেগমের একার নয়, কড়াইল বস্তির কয়েক হাজার পরিবারের লাখো মানুষের জীবনে নেমে এসেছে এমন দুর্দশা। গত শনিবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া প্রবল বর্ষণে ব্যাপক জলাবদ্ধতা দেখা দেয় রাজধানীর অন্যান্য স্থানের মতো কড়াইল বস্তিতেও। এতে ভুগছেন শ্রমজীবী আর নিম্ন আয়ের মানুষ। বেশির ভাগ ঘরবাড়িতে নোংরা পানি আর ময়লা-আবর্জনা ঢুকে পড়ায় ভোগান্তির শেষ নেই। অনেকের ঘরে পানি এতটাই বেশি ছিল যে আসবাব ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের ঠাঁই মিলেছে খাটের ওপর।
সিটি করপোরেশন আর প্রশাসনের কেউ খোঁজ না নেওয়ায় নিজেদের উদ্যোগে যেটুকু পানি সরানো গেছে, তার মধ্যেই নারী-পুরুষ, শিশুসহ পরিবারের সবার রাত কাটছে দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে। দু-একটি রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন ত্রাণসামগ্রী নিয়ে পাশে দাঁড়ালেও তা যৎসামান্য।
গতকাল সকাল থেকে কড়াইল বস্তি ঘুরে দেখা গেছে, জলাবদ্ধ মানুষের বিষণ্ন মুখ। এর মধ্যেও ভালো খবর হলো দুপুরের পর থেকে মূল সড়কসংলগ্ন বস্তির ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেছে। তবে ভেতরের দিকের ঘরবাড়িতে গভীর রাত পর্যন্ত হাঁটু বা কোমরপানি ছিল।
১৬০ একর আয়তন ও তিন লাখের বেশি শ্রমজীবী মানুষের বসবাসের এলাকা কড়াইল বস্তিটি ঢাকার অন্যতম নিচু এলাকায় হওয়ায় প্রতি বর্ষা মৌসুমেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এবার দুদিনের বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা মাত্রা ছাড়ায়।
বস্তিবাসী জানান, খালের নোংরা পানি ও এর সঙ্গে আসা আবর্জনা আর মলমূত্রে সয়লাব হয় অনেক ঘরবাড়ি। বস্তিসংলগ্ন গুলশান লেকের পানিও ঘরবাড়িতে ঢুকে পড়ে। অন্যদিকে মাটি ও কেরোসিনের চুলা ডুবে যাওয়ায় রান্না বন্ধ হয়ে যায়। দুই রাত নির্ঘুম কেটেছে বস্তিবাসীর। ফ্রিজ, টিভিসহ প্রয়োজনীয় জিনিস রাখতে হয়েছে খাটের ওপর। রোববার সন্ধ্যার পর বৃষ্টি কমায় অনেকে নিজ উদ্যোগে কিছুটা পানি সেচে বের করেছিলেন। গতকাল ভোর থেকে বৃষ্টি শুরু হলে পানি ঢুকে আবার দুর্ভোগে পড়েন তারা।
কড়াইল বস্তির বেলতলা আদর্শনগরের বাসিন্দা ও ভ্যানচালক খোকা মিয়া জানান, বস্তির ঘর ভাড়া নিয়ে তিনি পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন। প্রবল বর্ষণ আর খালের পানিতে তাদের ঘরের খাট ডুবে যায়। দুটি রাত কেটেছে প্রায় না ঘুমিয়ে। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী পারভেজ জানায়, টিনের ফুটো দিয়ে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়ায় তার বই-খাতা ভিজে গেছে।
এরশাদনগর এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, সিটি করপোরেশন থেকে একজন এসেছিলেন খোঁজখবর নিতে। তবে সেটি পানি কিছুটা নেমে যাওয়ার পর আজ (সোমবার) দুপুরের দিকে।
বস্তির বাসিন্দা মনির ফরাজীর মালিকানাধীন রিকশা গ্যারেজের পুরোটা এখনও পানিতে থইথই করছে। দুর্ঘটনা এড়াতে গ্যারেজটির বিদ্যুৎসংযোগ বন্ধ রেখে সব অটোরিকশা, ব্যাটারি আর চার্জার উঁচু সড়কের ওপর নিয়ে রাখতে হয়েছে। রিকশা গ্যারেজটির ম্যানেজার ফারুক বলেন, ‘দুই রাত ধরে কেউই আমরা ঘুমাতে পারিনি। আজও পানি আছে। জানি না এখনও কী দুর্ভোগ বাকি আছে!’
কড়াইল বস্তির দুর্গত এসব মানুষের
ভাগ্যে তেমন ত্রাণসামগ্রী জোটেনি। তবে রোববার বিএনপির স্থানীয় এক নেতা এলাকায় এসে খোঁজখবর নিয়ে গেছেন বলে জানান
কেউ কেউ।
সবজি বিক্রেতা হাসিবুর রহমান জানান, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে অল্প কয়েকটি এলাকায় মুড়ি, চিড়া, বিস্কুটসহ শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। জামায়াত নেতা জাকির রোববার রাতে এসে বস্তির বেশ কিছু ঘরে খিচুড়িও দিয়েছেন।