মুফতি আবু হানিফ শেখ:
মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের কারণে শরিয়ত এক্ষেত্রে নারীদের প্রধানত দুটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে:
১. সায়্যেবা (তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারী)
যেহেতু বিবাহিত জীবনের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে তাদের লজ্জার জড়তা কিছুটা কম থাকে, তাই তাদের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বা মৌখিক বক্তব্যকে সম্মতির জন্য জরুরি করা হয়েছে। কারণ তারা মনের কথা কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে।
وَصَمْتُها وضِحْكُها وبكاؤُها بلا صوتٍ إذْنٌ ومعه (أي مع الصوت) رَدٌّ حينَ استئذانِه ، أو بعد بلوغِ الخبرِ بشرطِ تسميةِ الزَّوج
অর্থ : ‘পাত্রের নাম উল্লেখ করে অনুমতি চাওয়ার সময় কিংবা (বিয়ের) সংবাদ পৌঁছানোর পর কুমারী মেয়ের নীরবতা, মৃদু হাসি এবং আওয়াজহীন কান্না সম্মতির লক্ষণ বা অনুমতি হিসেবে গণ্য হবে। তবে কান্নার সাথে যদি আওয়াজ থাকে (অর্থাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠে), অথবা উপহাসমূলক অট্রহাসি দেয়, তবে তা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান বলে গণ্য হবে।’ (শরহে বেকায়া, ৩/১৭)
ইঙ্গিতবাচক সম্মতির ক্ষেত্রে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত :
তবে ইঙ্গিতবাচক সম্মতির বিষয়টি যেহেতু সুনিশ্চিত কোন মাধ্যম নয়, বরং সম্মতির আলামত বা পরোক্ষ লক্ষণ, তাই ফিকাহবিদগণ কোনো ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে এখানে দুটি শর্ত যুক্ত করেছেন:
প্রথম শর্ত :
এই পরোক্ষ সম্মতি বা নীরবতার বিষয়টি শুধু তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন পাত্রের প্রস্তাবটি মেয়ের ওলি (শরিয়ত নির্দেশিত অভিভাবক) বা তার প্রেরিত দূতের পক্ষ থেকে উত্থাপন করা হবে। কারণ আপনজনদের সামনেই কুমারী মেয়ের লজ্জাশীলতা বেশি কাজ করে। অন্য কারও বেলায় বিষয়টি তেমন নয়। তাই ওলি ছাড়া বাইরের অন্য কেউ অনুমতি চাইলে কুমারী মেয়ের স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্যই লাগবে, নীরবতা চলবে না। আল্লামা ইবনে নুজাইম (রহ.) বলেন :
قَوْلُهُ وَإِنْ اسْتَأْذَنَهَا غَيْرُ الْوَلِيِّ فَلَا بُدَّ مِنْ الْقَوْلِ كَالثَّيِّبِ) أَيْ فَلَا يَكْفِي السُّكُوتُ؛ لِأَنَّهُ لِقِلَّةِ الِالْتِفَاتِ إلَى كَلَامِهِ فَلَمْ يقعْ دَلَالَةً عَلَى الرِّضَا وَلَوْ وَقَعَ فَهُوَ مُحْتَمَلٌ وَالِاكْتِفَاءُ بِمِثْلِهِ لِلْحَاجَةِ وَلَا حَاجَةَ فِي غَيْرِ الْأَوْلِيَاءِ
অর্থ: 'আর যদি ওলি ছাড়া অন্য কেউ তার কাছে অনুমতি চায়, তবে ছায়্যেবা নারীর মতোই স্পষ্ট মৌখিক বক্তব্য আবশ্যক।' অর্থাৎ, এক্ষেত্রে কেবল নীরবতা যথেষ্ট হবে না। কারণ পরপুরুষ বা অনাত্মীয়ের কথার প্রতি মেয়ের মনোযোগ বা সমীহ কম থাকতে পারে; ফলে তার নীরবতা সন্তুষ্টির অকাট্য দলিল বা আলামত হিসেবে গণ্য হবে না। আর যদি আলামত ধরেও নেওয়া হয়, তবুও তাতে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। মূলত (লজ্জার কারণে) বিশেষ প্রয়োজনে কুমারী মেয়ের নীরবতাকে ওলির ক্ষেত্রে অনুমতি ধরা হয়েছে, কিন্তু ওলি ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজনীয়তা বা ওজর খাটে না।’ (আল-বাহরুর রায়েক, ৩/১২৩ )
দ্বিতীয় শর্ত :
কনের এই আচরণগত অভিব্যক্তিগুলো বাস্তবিকই অবস্থার আলোকে সম্মতির ইঙ্গিতবাহী হতে হবে। যদি পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে ভিন্ন কোনো অর্থ প্রকাশ পায় (যেমন মেয়েটি ভয়ে বা অন্য কোনো চাপে কাঁদছে বা অট্টহাসি হাসছে বা অন্য কোন কারণে চুপ থাকছে), তবে তা আমলে নিতে হবে। ইমাম ইবনুল হুমাম (রহ.) 'ফাতহুল কদির'-এ বলেন :
وَالْمُعَوَّلُ عَلَيْهِ اعْتِبَارُ قَرَائِنِ الْأَحْوَالِ فِي الْبُكَاءِ وَالضَّحِكِ، فَإِنْ تَعَارَضَتْ أَوْ أُشْكِلَ اُحْتِيطَ
অর্থ : ‘এক্ষেত্রে মূল কথা হলো, কান্না ও হাসির সময় পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও আলামতসমূহ বিবেচনা করা। যদি আলামতগুলোর মধ্যে পরস্পর বৈপরীত্য দেখা দেয় কিংবা বিষয়টি অস্পষ্ট বা সন্দেহজনক মনে হয়, তবে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে (অর্থাৎ স্পষ্ট মৌখিক অনুমতি নিতে হবে)। (ফাতহুল কদির, ৩/২৬৪)
অতএব, অভিভাবক, পরিবার ও সমাজের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো নারীর এই শরয়ি ও মানবিক অধিকারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া এবং বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তার মতামতকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করা। এতে ইসলামের সৌন্দর্য যেমন ফুটে উঠবে, তেমনি পরিবার ও সমাজে স্থায়ী শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে।